Wednesday, June 26, 2013

রমনা কালী মন্দির ,ঢাকা,বাংলাদেশ

রমনা কালী মন্দির ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত হিন্দু মন্দিরসমূহের মধ্যে অন্যতম ছিল। এটি রমনা কালীবাড়ি নামেও পরিচিত। এটি প্রায় এক হাজার বছরেরও পুরাতন বলে বিশ্বাস করা হয় এবং বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার রমনা পার্কের (যার বর্তমান নাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বহির্ভাগে অবস্থিত।এই মন্দিরটিরও একটা গল্প আছে। একবার নাকি নেপাল থেকে দেবী কালীর একজন ভক্ত এসেছিলেন। তিনিই তৈরি করেছিলেন এই কালী মন্দির। ঢাকা শহরের অন্যতম পুরোনো আর বনেদি এই কালী মন্দিরটি পরে ভাওয়ালের রানী বিলাসমণি দেবী সংস্কার করেন।

শ্রী শ্রী রমনা কালী (ভদ্রা কালী) মন্দিরের এবং শ্রী শ্রী আনন্দময়ী আশ্রমের অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে জানবার ইচ্ছে অনেকেই মনে করেন. রমনা কালী বাড়ীর নাম থেকে রমনা থানার নামটি হয়েছে, আদৌ ঘটনাটি সত্যি নয়। রমান শব্দের অর্থ ইংরেজীতে ল'ন, বাংলায়া ঠিক এর প্রতিশব্দ আছে কিনা জানি না, তবে রমনা শব্দটি ফার্সী শব্দ এবং এ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ১৬১০ সালে মোঘল সম্রাটের সেনাপতি ইসলাম খাঁ।

মোঘল আমলের শেষ দিকে মোঘল সেনাপতি মান সিংহের সহযোগিতা ও বার ভূঁইয়ার অন্যতম কেদার রায় এর অর্থে শাহবাজ মসজিদের উত্তর দিকে হরিচরণ গিরি ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন কৃপা সিদ্ধির আখড়া যা পরবর্তীতে ভদ্রাকালী বাড়ী এবং পর্যায়ক্রমে নামকরণ করা হয় রমনা কালী মন্দির হিসেবে। হরিচরণ গিরি ও কেদার রায় এবং গুরু ছিলেন গোপাল গিরি, গোপাল গিরি স্মরণেই রমনা (ভদ্রা) কালী মন্দির স্থাপন করা হয় মোঘল সম্রাটের পৃষ্টপোষকতায়। ঐতিহাসিক দানীর মতে, রমনা কালী মন্দির এলাকায় মোট ৩টি পুকুর ছিল্ৎ একটি বর্তমান শিশু পার্কের মধ্যে, একটি শ্রী মা আনন্দময়ী আশ্রমের নিকটে এবং তৃতীয়টি বর্তমানে বিদ্যমান আছে যা জনসাধারণ জানে রমনা কালী বাড়ির পুকুর হিসেবে। তখন থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিকট রমান কালী বাড়ী বা ভদ্রা দেবীর বাড়ী একটি তীর্থ ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিতি পায় এবং বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রী লংকা, বার্মা থেকে অসংখ্য ভক্ত ভদ্রা দেবীর মন্দিরে আসতেন প্রার্থনা করতে। তৎকালে রমনা এলাকা শুধু হিন্দু বা মুসলিম সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ছিল না। গ্রীকদের উপসনালয় ও গ্রীক কবর স্থান রমনা এলাকায় ছিল এবং যা বর্তমানে আছে। পাঠকবৃন্দ তিন নেতার মাজার থেকে বাংলা একাডেমীর পাশ দিয়ে কলা ভবনে যেতে দেখবেন ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্ররে গ্রীক স্মৃতি সৌধটি, এখনও যা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, যা আপনার দৃষ্টি আকর্ষন করবে।


 মোঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর রমনা এলাকা হয়ে উঠে নিভৃত জঙ্গল ও বিরাণ অঞ্চল, শুধুমাত্র মসজিদে ও মন্দিরে লোকজনের আনাগোনা ছিল। এরপর ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার বৃটিশ কালেক্টর মি. ডয়েস ঢাকা শহরের উন্নয়নকল্পে কিছু বিশেষ পদক্ষেপ নেন। তখন থেকেই ঢাকা আবার পুরানো গৌরব ফিরে পেতে শুরু করে। আর সে সময়ই নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রমনার কালী মন্দির ছাড়া অন্যান্য পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে ফেলা হয়। আর জঙ্গল পরিষ্কার করে রমনাকে একটি পরিচ্ছন্ন এলাকায় রূপ দেয়া হয়। পুরোনো হাইকোর্ট ভবনের পশ্চিমে বর্তমানে অবস্থিত মসজিদ এবং সমাধিগুলো ডয়েসের নির্দেশে অক্ষত রাখা হয়। এই এলাকাটির নাম দেওয়া হয় রমনা গ্রিন। এবং এলাকাটিকে রেসকোর্স ময়দান বা ঘোড়দৌড়ের মাঠ হিসেবে ব্যবহারের জন্য কাঠের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। তখন মাঠটির মাঝখানে ছিল মন্দির ।

রেসকোর্স ময়দানের নাম বদলে গেছে। পাশেই রয়েছে রমনা কালী মন্দির ও শ্রী শ্রী মা আনন্দময়ী আশ্রম। একাত্তরের সাথে যাদের রয়েছে নিবিড় সম্বন্ধ। ঊনিশশো একাত্তর সালের ছাব্বিশে মার্চ সকাল এগারোটার দিকে পাকিস্তানি সেনারা এই আশ্রমে প্রবেশ করে। পুরো আশ্রম ঘেরাও করে এরা লোকজনদের আটকে রাখে- বের হতে দেয় না কাউকে। সে সময় এই পিশাচদের সাথে ছিলো পুরোনো ঢাকা থেকে ১৯৭০ এর নির্বাচনে পরাজিত মুসলীম লীগ প্রার্থী পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অন্যতম দোসর খাজা খায়েবউদ্দিন। প্রধানত এই হিংস্র জানোয়ারের তৎপরতায়ই ২৭ মার্চের গভীর রাতে রমনা কালী মন্দির ও শ্রী শ্রী মা আনন্দময়ী আশ্রমের হত্যাকান্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়।

২৭ মার্চ গভীর রাতে সান্ধ্য আইন চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মন্দির ও আশ্রম ঘেরাও করে। সেনাবাহিনীর সার্চ লাইটের আলোতে গোটা রমনা এলাকা আলোকিতো হয়ে যায়। তারপরই শুরু হয় গুলিবর্ষণ। রমনা কালীমন্দিরে প্রবেশ করে প্রতিমা গুঁড়িয়ে দেয় এই অসভ্য বর্বর সেনাবাহিনী।মন্দির তারপর গোলাবর্ষণ করে- মন্দির ও আশ্রম পরিণত হয় এক ধ্বংসাবশেষে। 


 সেখানেই তারা হত্যা করে রমনা কালী মন্দিরের অধ্যক্ষ স্বামী পরমানন্দ গিরিকে। ইতিহাস পাঠে জানা যায়- এই সাধক মৃত্যুর আগে আশ্রমের অন্যান্যদের উদ্দেশে বলে গিয়েছিলেন- আমি তোমাদের বাঁচাতে পারলাম না, কিন্তু আশীর্বাদ করি- দেশ স্বাধীন হবেই। সব শেষে বোমা দিয়ে ধ্বংস করে দেয় পুরো মন্দির। (ছবিতে সাদাকালো অংশ ধ্বংস হবার আগের মন্দির)

রমনার কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমে একাত্তরের শহিদদের তালিকা:

১। শ্রীমৎ স্বামী পরমানন্দ গিরি

২। রঘু লাল দাস

৩। ধীরেণ লাল ঘোষ

৪। শ্রীমতি লক্ষ্মী চৌহান

৫। হীরা লাল পাশী

৬। বাবু লাল

৭। সূর্য

৮। রাম গোপাল

৯। সন্তোষ পাল

১০। সুনীল ঘোষ

১১। মোহন দাস

১২। রাম বিলাস দাস

১৩। জয়ন্ত চক্রবর্তী

১৪। বিরাজ কুমার

১৫। ভোলা পাশী

১৬। বাবু লাল দাস

১৭। গণেশ চন্দ্র দাস

১৮। সরষু দাস

১৯। বসুন্ত মালী

২০। শৈবল্লি

২১। কিশোরী ঠাকুর

২২। বারিক লাল ঘোষ

২৩। বাবুল দাস দ্রুপতি

২৪। বাদল চন্দ্র রায়

২৫। ত্রিদিব কুমার রায়

২৬। রামগতি

২৭। শিব সাধন চক্রবর্তী (সাংবাদিক)

২৮। পুরণ দাস




২৯। মানিক দাস

৩০। বিভূতি চক্রবর্তী

৩১। নান্দু লাল

৩২। সরোজ

৩৩। রাজকুমার

৩৪। গণে মুচি

৩৫। বলিরাম

৩৬। সুরত বল্লি

৩৮। রমেশ ধোপা

৩৯। বাবু নন্দন

৪০। হিরুয়া

এছাড়া ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকাটাও বেশ বড়ো।

পাক সেনাবাহিনী হামলা চালিয়ে ‘৭১’র রমনা কালি মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রমটি দুটি ধ্বংস করেছিল। কিন্তু তা আজও নির্মাণ হয়নি। এই মন্দিরটি হিন্দু সম্প্রদায়ের ২য় বৃহত্তর জাতীয় মন্দির। অবিলম্বে এই মন্দিরটির জায়গা ও মন্দিরটি পুনঃনির্মাণ করে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবী জানাই।

No comments:

Post a Comment